Homeগল্পযে জন আছে মাঝখানে

যে জন আছে মাঝখানে

“তাড়াতাড়ি ওঠ। তাড়াতাড়ি ওঠ। ঐতো, ওখানে জায়গা আছে, বসে পড়, বসে পড়….”। এক দেড় মাস ধরে আমেদাবাদের পাবলিক বাসে যেতে যেতে এই ক’টি গুজরাটি শব্দ আমার চেনা হয়ে গেছে।

ধরফড়িয়ে বাসে উঠে যিনি আমার পাশের সীটে বসে হাঁফ ছাড়লেন, তিনি মধ্যবয়সিনী, পৃথুলা গুজরাটি বেন। পরনে সামনে আঁচল করা উজ্জ্বল হলুদ রঙের বাঁধনী শাড়ি। হাত ভর্তি রঙবেরঙের পাথরবসানো লাখ কি চুড়িয়াঁ। কোমরে চাবির মোটা গুচ্ছ দেখে বোঝা যায় জবরদস্ত গিন্নী! সংসারটাকে চাবির গোছায় সযত্নে বেঁধে রেখেছেন!

স্বামী, পুত্রকন্যাকে সঙ্গে নিয়ে সুখী পরিবার। কোথাও বেড়াতে চলেছে। ঝুড়িব্যাগে ছোট-বড়-মাঝারি নানা সাইজের স্টীলের টিফিনকৌটো। সেখান থেকে গুজরাটি ফারসানের মশালাদার সুঘ্রাণ আমার ক্ষিদে বাড়িয়ে দিল।

এই পর্যন্ত সব কিছু ঠিকঠাক, মানানসই ছিল। হঠাৎ আমার চোখ আটকে গেল তাঁর বাঁ হাতে খোদাই করা উল্কিটিতে পরিষ্কার বাংলায় সেখানে লেখা, ‘সাধন’ কৌতুহলী চোখ আর মন সুযোগ খুঁজছিল। এরমধ‌্যে মায়ের ফোন!

পাক্কা পাঁচ মিনিট ধরে মায়ের সাবধানবাণী। রোজ একই কথা। “কি খাচ্ছিস, কখন ফিরবি, ওখানকার লোকজন ভালো তো? আমার খুব চিন্তা হয়”… রোজকার এইসব প্রশ্নবাণ সামলানো অভ্যেস হয়ে গেছে আমার। তাড়াতাড়ি কথা সারলাম। মন পড়ে আছে আমার সহযাত্রিনীর হাতের উল্কিতে।

এম.বি.কোর্সের প্রোজেক্টের কাজে আমার আমেদাবাদ আসা। প্রতিদিন কাজের সূত্রে শহরতলীতে যেতে যেতে এখানকার মানুষজনের ভাষা, যৌথপরিবার প্রীতি, ব্যবসায়িক বুদ্ধি সম্পর্কে কিছুটা জ্ঞান হয়েছে। সবথেকে ভালোবাসা হয়েছে সুস্বাদু গুজরাটি স্ন্যাকস বা ফারসানের সঙ্গে। যাঁদের সঙ্গে আমার প্রতিদিনের কাজ তাঁরা রোজই কেউ না কেউ আমাকে পাত্রা, থেপলা, খান্ডভী সস্নেহে অফার করেন। এখানকার মহিলারা স্পষ্টভাষী, বাস্তববাদী হয়েও মানুষ খারাপ নন।

তবে আমার পাশে বসা মানুষটির সম্পর্কে সব ধারণা উল্টেপাল্টে গেল, যখন তিনি পরিষ্কার বাংলায় জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি বাঙালি, কোলকাতার?”

“হ্যাঁ, আপনি?”

আমার চোখেমুখে তখন অনেক জিজ্ঞাসার চিহ্ন।

দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে তিনি বললেন, “ভবানীপুরে আমার বাড়ি ছিল। এখনো কেউ কেউ রিস্তেদার আছে সেখানে, তবে যোগাযোগ নেই।”

লক্ষ্য করলাম, লম্বা কথোপকথনে বাংলা শব্দভাণ্ডারে তাঁর টান পড়ছিল।

আমি ছটফট করছিলাম তার উল্কি আর গুজরাটি পরিবার নিয়ে। কৌতুহল চাপতে না পেরে জিজ্ঞেসই করে ফেললাম, “সাধন কার নাম? আমেদাবাদে এলেন কিভাবে?।

ভদ্রমহিলা একটু চুপ করে থেকে বলতে লাগলেন তাঁর অতীত জীবন—

কমলা নাম তাঁর। অল্পবয়সে বিয়ে হয়েছিল তাঁর কোলকাতারই এক বাঙালি ড্রাইভারের সঙ্গে। ভালোই কাটছিল সে দিনগুলি। নতুন বিয়ের টগবগে ভালোবাসায়, সোহাগে-শখে স্বামীর নামটি সে হাতে খোদাই করেছিল।

উল্কিতে হাত বোলাতে বোলাতে সেদিনের সেই ছুঁচ ফোটানোর ব্যথা, উন্মাদনা যেন আজও কমলা অনুভব করল।

সাধনের হাতেও জ্বলজ্বল করত কমলার নাম। তবে সে ভালোবাসার মানুষটিকে বাঁচিয়ে রাখতে পারল কই? মাত্র কিছুদিনের দাম্পত্য জীবন।পথে পথে ঘোরা ড্রাইভার স্বামীটির পথেই মৃত্যু হল।গাড়ি দুর্ঘটনায়।

কমলা বাপের ঘরে ফিরে এল। বাপ তার কাজ করত আমেদাবাদের সুতো কলে। বড় দু-জন ভাই ততদিনে নিজেদের কাজ আর সংসার গুছিয়ে নিয়েছে। তাদের আর দেখেনা। এদিকে জীবনও থেমে থাকেনা। বিধবা, সোমত্ত মেয়েকে নিয়ে মা পড়ল আতান্তরে। কি করে তারা তখন? বাবার পরামর্শে অসহায় মেয়েটি তার অতীত জীবনকে পিছনে ফেলে মায়ের সঙ্গে চলে এল ভারতের এই পশ্চিম প্রান্তে।

মা-মেয়ে কাজ নিল পাঁপড়ের কারখানায়। সেখানে কাজ করতে করতে শান্ত স্বভাব কমলার রিস্তা এল এক গুজরাটি পরিবারে। পাত্র দোজবরে। একটি পাঁচ বছরের কন্যা রেখে স্ত্রী মারা গেছে তার জটিল অসুখে।

“আমার আর উপায় ছিল না গো। মা-বাবার বয়স হয়েছিল। এই বিদেশ বিভূঁইয়ে আমি বাকি জীবনটা কি করে কাটাতাম?”

কথা বলতে বলতে কমলা তার ঝুড়িব্যাগে রাখা স্টীলের টিফিন কৌটো খুলে তিনটি বেসনের লাড্ডু বার করে ছেলেমেয়ে আর আমার হাতে দিল।

আমি ইতস্ততঃ করেও নিয়ে নিলাম। “চমৎকার স্বাদ”, তারিফ না করে পারলাম না।

একটু হেসে বলল, “আমার বড় মেয়ের গোদ ভরাই। তাই তার শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছি”।

গল্প তখনও শেষ হয়নি। কমলা একান্নবর্তী গুজরাটি পরিবারে মোটা (বড়) ভাইয়ের বহু হয়ে এল। স্বামীর প্রথম পক্ষের মেয়েটিকে আপন করে নিল। নিরামিষাশী হল। মাছভাত খাওয়া বাঙালি মেয়েটি শিখে ফেলল ঢোকলা, থেপলা, কানসার…. পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে রপ্ত করল একান্নবর্তী পরিবারের আদব-কায়দা। পালন করতে লাগল জন্মাষ্টমী, নবরাত্রি, মকর সংক্রান্তির বারব্রত। দুটি সন্তান হল তার। বড় মেয়েটির বিয়ে দিয়েছে। সে সন্তান সম্ভবা।

আজ কমলার ভরা সংসার। তবু অতীত যে বড় পিছু টানে তাকে!

মা-বাবা স্বর্গে গেছেন, তাই বাংলায় কথা বলার সুখটুকুও তার চলে গেছে। পরিবারের চাপে নিজের সন্তানদের বাংলা শেখাতে পারে নি সে।

জীবনের এত কিছু পরিবর্তনের মধ্যেও সে সব কথা ভুলতে পারে না। অতীত কি ভোলা যায়? কিছু কথা রয়ে যায় গোপনে। একান্ত আপন হয়ে। কমলার শরীরের সঙ্গে যে জুড়ে গেছে তার প্রথম প্রেম! তার প্রথম চেনা অক্ষর!

সুহাগিন কমলার হাত ধরে তার পুরনো সোহাগ। হাত ভরা চুড়ির রিনিঝিনির ফাঁকে সে প্রতিদিন উঁকি দিয়ে যায়।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -spot_imgspot_imgspot_imgspot_img

Most Popular

Recent Comments