অনুবাদ : অমি আক্তার
ডাচ সাহিত্যিক ইয়ায়েল ভ্যান ডার ওয়ুডেন এর প্রথম উপন্যাস ‘The Safekeep’ প্রকাশের পরই সমালোচক ও পাঠকমহলে বেশ সাড়া ফেলে। এই উপন্যাসের জন্য তিনি আন্তর্জাতিক মর্যাদাপূর্ণ ‘Women’s Prize for Fiction’ পেয়েছেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রিয়েটিভ রাইটিং ও তুলনামূলক সাহিত্য পড়ান।
পুরস্কারপ্রাপ্তি, লেখালেখি ও ব্যক্তিগত নানাপ্রসঙ্গে অনলাইন প্লাটফর্ম লিটেরারি হাভকে দেওয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারটি অনুবাদ করেছেন অমি আক্তার।
প্রশ্ন: কে আপনার বই সবচেয়ে বেশি পড়ুক চেয়েছেন?
ইয়ায়েল: এস্টার পেরেল। একবার মজা করে বলেছিলাম—আমি চাই যেন মা এসে বলেন, “তুমি ভালো করেছো।” আজও সেই কথাতেই আমি আটকে আছি। তাই বলব, “আমি কি ভালো করেছি, এস্টার?”
প্রশ্ন: এ বছর কোন বইটি আপনাকে সবচেয়ে বেশি আলোড়িত করেছে?
ইয়ায়েল: অসংখ্য বই। বই প্রকাশের পর মানুষ বুঝতে শুরু করেছে আমি কী পছন্দ করব, আর সেই হিসেবেই আমাকে বই পাঠাচ্ছে। এতে এক অনন্ত পাঠ্যতালিকা তৈরি হয়েছে—কেউ নারীদের প্রতিশোধের গল্প, কেউ ঐতিহাসিক চরিত্র নিয়ে লেখা, কেউ আবার বাড়ি ও গৃহস্থালি প্রসঙ্গে বই পাঠাচ্ছে। সম্প্রতি জো হারকিনের ‘The Pretender’ পড়েছি। বইটা শেষ করার পর থেকেই মন খারাপ কাজ করছে, বারবার মনে হচ্ছে আবার শুরু করি।
প্রশ্ন: সাক্ষাৎকারে কোন প্রশ্নটি সবসময় শুনতে চান?
ইয়ায়েল: বইয়ের বাইরের কোনো প্রশ্ন পেলেই আমি খুশি হই। ব্রিস্টলে এক অনুষ্ঠানে আমাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল—উপন্যাসে গৃহস্থালির ভূমিকা কী? তখন আমার পুরোনো লেকচার থেকে বলেছিলাম, কীভাবে আসলে শহরতলির লন বা ঘাস জীবন-মৃত্যুর প্রতীক হয়ে উঠেছিল। জানেন কি, কাটা ঘাসের গন্ধ আসলে গাছের চাপজনিত একধরনের রাসায়নিক? মানে আমরা যখন বলি, “আমি সকালের কাটা ঘাসের গন্ধ ভালোবাসি”, আসলে তখন বলছি, “আমি ভালোবাসি যখন ঘাস চিৎকার করে ব্যথায় আঁতকে উঠে।”
প্রশ্ন: পুরস্কার জয়ের খবর প্রথম কাকে জানিয়েছেন?
ইয়ায়েল: আমার পরিবারই লাইভ ফিড দেখছিল। আমি তখন ফোন এয়ারপ্লেন মোডে রেখেছিলাম, কারণ ভয় ছিল সবাই একসাথে ফোন করবে। তবে, ঘোষণার পর প্রথমেই বাবা-মাকে জানিয়েছি, গ্রুপ চ্যাটে ছবি পাঠিয়েছি। হাতে পুরস্কার নিয়ে হোটেল রুমে তোলা ছবিতে আমার খালি পা, অগোছালো টেবিল, মেঝেতে মোজা-রসিদ-সবই ধরা পড়েছে—সেই ছবিটাই সবাইকে পাঠালাম।
প্রশ্ন: দিনের কোন সময়ে আপনি লিখতে ভালোবাসেন?
ইয়ায়েল: বিশের কোঠায় রাতজাগা লেখক ছিলাম। পরে শিক্ষকতা শুরু করলে ভোরে লিখতে হতো। এখন বিকেলেই লিখতে ভালো লাগে, কারণ কিছু বিকেল অবসর পাই কিছুটা। আমি শিখেছি—লিখতে হলে নিয়মিত লিখতে হবে, খারাপ হলেও লিখতে হবে। আর সন্ধ্যার পর লিখতে বসলে, ঘুমানোর সময় হয়ে গেলেও মাথার ভেতর লেখা চলতেই থাকে, তাই এখন আর রাতে লিখি না।
প্রশ্ন: লেখায় ভাটা পড়লে কী করেন?
ইয়ায়েল: কয়েক মাসের জন্য প্রকল্পটা সরিয়ে রাখি। বই পড়ি, সিনেমা দেখি, জাদুঘরে যাই, বন্ধুদের গল্প শুনি। কখনোবা অন্য কিছু লিখি-প্রবন্ধ, কোনো দৃশ্যের খসড়া। মূল কথা হলো চাপটা সরিয়ে নেওয়া, যেন আবার আনন্দ নিয়ে শিল্প বা লেখালেখি ভোগ করতে পারি।
প্রশ্ন: কোন বইগুলো আপনি বারবার পড়েন?
ইয়ায়েল: ‘Emma’ এবং ‘Pride and Prejudice’ বারবার পড়ি। এছাড়া ই. এম. ফস্টারের ‘Maurice’ মাঝে মাঝে পড়ে নিশ্চিত হই—আমার ভেতর আকাঙ্ক্ষার সেই ক্ষমতা এখনো আছে।
প্রশ্ন: লেখালেখির বাইরের কোন শিল্পটি ছাড়া নিজের জীবন কল্পনা করতে পারেন না?
ইয়ায়েল: আমার ঘরে মায়ের আঁকা কয়েকটি ছবি টাঙানো আছে, সত্যি বলতে গেলে মা-ই আমার সবচেয়ে প্রিয় শিল্পী। বাবা-মা দুজনেই আমাকে শিখিয়েছেন শিল্পকে ভালোবাসতে, আর মায়ের ছবিগুলো সেই ভালোবাসার সবচেয়ে বড় উৎস। তিনি এত সুন্দরভাবে প্রকৃতিকে ফুটিয়ে তুলেন যেন মনে হয় আমি কেবল দর্শক নই, বরং একজন সৌভাগ্যবান সাক্ষী। আমার নীরব ঘরে বিস্ময়সূচক চিহ্নের মতো এই ছবিগুলো টাঙানো থাকে, চোখে পড়লেই মনে হয় এরা গল্প বলছে। তাই মায়ের এই আঁকাগুলো ছাড়া আমি নিজের জীবন কল্পনাই করতে পারি না।
প্রশ্ন: লেখালেখির বাইরে আপনার পেশা কী?
ইয়ায়েল: আমি সাধারণত ক্রিয়েটিভ রাইটিং এবং তুলনামূলক সাহিত্য পড়াই। আপাতত বই-সংক্রান্ত কাজের জন্য ছুটি নিয়েছি। তবে ছাত্ররা প্রায়ই ভাবে ঘাস নিয়ে লেকচার পাবে না, কারণ আমি এই গল্প দিয়েই ক্লাস শুরু করি।
প্রশ্ন: লেখালেখির বিষয়ে পাওয়া সবচেয়ে ভালো পরামর্শ কোনটি?
ইয়ায়েল: সবচেয়ে ভালো পরামর্শ হলো—লিখতে থাকো, যতবার পারো, খারাপ হলেও লিখে যাও। লেখার অভ্যাসটাই সবচেয়ে জরুরি। আরেকটা জিনিস—নিজের সহযাত্রীদের খুঁজে নিতে হবে। বড় নায়ক কিংবা যাদের দেখে হিংসে হয় তাদের নয়, বরং যারা তোমার মতোই শুরু করেছে, একই পথে হাঁটছে তাদের খুঁজে নিতে হবে। কারণ একসময় তারাই তোমাকে টেনে তুলবে। কেউ হয়ত এজেন্ট পাবে, কেউ বড় কোনো পত্রিকার সম্পাদক হবে, কেউ লেখক না হলেও সেরা পাঠক হয়ে থাকবে। আর নিজের কাজ জমিয়ে না রেখে, অন্যকে পড়তে দিতে হবে। কারণ কোনো লেখা একা একা জন্ম নেয় না, প্রতিটি ভালো বইয়ের পেছনে থাকে অনেক মানুষের ছোঁয়া।
সোর্স: প্রতিবেদনটি বাংলা ট্রিবিউনে প্রচারিত হয়। https://www.banglatribune.com/literature/interviews/912191/%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A7%9F%E0%A6%AE%E0%A6%BF%E0%A6%A4-%E0%A6%B2%E0%A6%BF%E0%A6%96%E0%A6%A4%E0%A7%87-%E0%A6%B9%E0%A6%AC%E0%A7%87-%E0%A6%96%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A6%AA-%E0%A6%B9%E0%A6%B2%E0%A7%87%E0%A6%93-%E0%A6%B2%E0%A6%BF%E0%A6%96%E0%A6%A4%E0%A7%87-%E0%A6%B9%E0%A6%AC%E0%A7%87-%E0%A6%87%E0%A7%9F%E0%A6%BE%E0%A7%9F%E0%A7%87%E0%A6%B2


