‘চৌরঙ্গী’, ‘সীমাবন্ধ’ ও ‘জন অরণ্য’-এর মতো উপন্যাস লিখে যিনি দুই বাংলায়ই আলোচিত, সেই মণিশংকর মুখোপাধ্যায় আর নেই। তিনি পাঠকের কাছে ‘শংকর’ নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৩ বছর।
কলকাতার আনন্দবাজার লিখেছে, একাধিক শারীরিক সমস্যা নিয়ে দিন ১৫ আগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন বর্ষীয়ান এই সাহিত্যিক। এক পর্যায়ে তাঁর খাওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। গতকাল শুক্রবার দুপুর পৌনে ১টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়।
বেশ কিছুদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যায় ভুগছিলেন শংকর। গত ডিসেম্বরে পড়ে গিয়ে কোমরের হাড় ভেঙে গিয়েছিল তাঁর।সে সময় অস্ত্রোপচারের পর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন।
হাসপাতালে প্রয়াত সাহিত্যিকের চিকিৎসক সুদীপ্ত মিত্র বলেন, ‘সপ্তাহ দুয়েক আগে ফের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। গত ৪ ফেব্রুয়ারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাঁকে। এত দিন সেখানেই চিকিৎসাধীন ছিলেন। শুক্রবার দুপুরে সেখানেই জীবনাবসান ঘটে সাহিত্যিকের।’
মণিশংকরের প্রয়াণে তাঁর ভক্ত পাঠক, শুভানুধ্যায়ী ও বাংলা বিনোদন দুনিয়ায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। শোক জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এক্স হ্যান্ডেলে তিনি লিখেছেন, “বাংলার প্রখ্যাত সাহিত্যিক মণিশংকর মুখোপাধ্যায় (শংকর)-এর প্রয়াণে আমি গভীরভাবে শোকাহত। তাঁর প্রয়াণে বাংলা সাহিত্য জগতের একটি উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন হলো।‘চৌরঙ্গী’ থেকে ‘কত অজানারে’, ‘সীমাবদ্ধ’ থেকে ‘জন অরণ্য’—তাঁর কালজয়ী সৃষ্টিগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাঙালি পাঠককে মুগ্ধ করেছে। তাঁর লেখনীর আধারে উঠে এসেছে সাধারণ মানুষের জীবন সংগ্রামের না-বলা কথা। বিশেষ করে স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে তাঁর সুগভীর গবেষণা ও গ্রন্থসমূহ আমাদের কাছে অমূল্য সম্পদ। তাঁর প্রয়াণ আমাদের সাংস্কৃতিক জগতের এক অপূরণীয় ক্ষতি।”
১৯৩৩ সালের ৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশের যশোর জেলায় জন্ম মণিশংকরের। আইনজীবী বাবা হরিপদ মুখোপাধ্যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগেই কলকাতায় চলে যান। কলকাতার ঠিক ওপারেই এই শহরে বড় হতে হতে শংকরের মননে জমতে থাকে ভবিষ্যৎ সাহিত্যজীবনের বীজ। কৈশোরেই পিতৃহারা হন মণিশংকর। জীবনধারণের তাগিদে নানা কাজ করতে হয় তাঁকে—কখনও সেলসম্যান, কখনও টাইপরাইটার পরিষ্কার করার কাজ, কখনও আবার গৃহশিক্ষক। এর পাশাপাশি চলতে থাকে পড়াশোনাও। তবে তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায় কলকাতা হাই কোর্টের শেষ ইংরেজ ব্যারিস্টার নোয়েল ফ্রেডারিক বারওয়েলের করণিক হিসেবে কাজ করতে গিয়ে। বারওয়েলের কাছে কাজ করার সূত্রেই তাঁর সামনে খুলে যায় হাই কোর্ট, অফিসপাড়া আর সেই জগতের আড়ালের মানবজীবনের জটিল স্রোত—যে স্রোতই পরে হয়ে ওঠে তাঁর লেখার মূল রসদ। পাঠক তখন তাঁকে চিনবেন ‘শংকর’ নামে।
১৯৫৫ সালে প্রকাশিত হয় শংকরের প্রথম উপন্যাস ‘কত অজানারে’। শুরু থেকেই নিজের নাম সংক্ষিপ্ত করে তিনি ‘শংকর’ ছদ্মনামে লিখতে থাকেন। এই উপন্যাসের কেন্দ্রে ছিলেন বারওয়েল সাহেব, আর পটভূমিতে কলকাতা হাই কোর্টসহ শহর কলকাতা। শহরের নিছক “কাজের জায়গা” বলে পরিচিত পরিসরের ভেতরকার স্পন্দন, স্বার্থ-সমীকরণ আর মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্ব—শংকরের কলম সেটাই ধরতে পেরেছিল। প্রথম উপন্যাসেই জনপ্রিয়তা আসে। এরপর ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় ‘চৌরঙ্গী’, ‘সীমাবদ্ধ’, ‘জন অরণ্য’—যে দু’টি উপন্যাস পরে সত্যজিৎ রায়ের হাত ধরে চলচ্চিত্রে রূপ পায়। এই রচনাগুলির ভেতর দিয়ে সমকালীন শহুরে মধ্যবিত্তের সংকট, মূল্যবোধের ক্ষয়, উচ্চাশা ও আপসের টানাপড়েন—সবই উঠে আসে প্রবলভাবে।
‘চৌরঙ্গী’ অবলম্বনে ১৯৬৮ সালে পিনাকীভূষণ মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনায় সিনেমা হয়। কাহিনির পটভূমিতে ছিল শহরের কেন্দ্রে থাকা এক অভিজাত হোটেল—যাকে ঘিরে মধ্যবিত্তের স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা আর মোহের এক আলাদা জগৎ। সেই স্বপ্নের বুদবুদে একবার ফুঁ দিলেই কীভাবে ভেসে ওঠে ভেতরের আলো-ছায়া—উপন্যাসটি ঠিক সেই আবহই নির্মাণ করে। সিনেমায় স্যাটা বোস চরিত্রে উত্তমকুমারের অভিনয় দর্শকের মনে স্থায়ী ছাপ রেখে যায়। পরবর্তী সময়ে শংকর নিজেই নানা সাক্ষাৎকার-আলোচনায় বলেছেন, সত্যজিৎ রায় ও উত্তমকুমারের সঙ্গে তাঁর সৃষ্টিজগতের যোগ জনপ্রিয়তার পাল্লা অনেকটাই ভারী করে দেয়।
বাণিজ্যসফল লেখক হিসেবে শংকরের জনপ্রিয়তা যেমন ছিল বিপুল, তেমনই একাংশ তথাকথিত “রুচিশীল” পাঠকের মধ্যে তাঁর প্রতি খানিক ঔদ্ধত্যমিশ্রিত অবহেলাও দেখা গেছে। তবু বাস্তব সত্য হল—সংস্করণের পর সংস্করণ নিঃশেষ হওয়ার নজির কলকাতার বইপাড়ায় চোখে পড়ার মতো। একসময় বাঙালির বিয়েবাড়ির উপহারে শংকরের বই হয়ে ওঠে “মাস্ট”। এত বিপুল বিক্রি সত্ত্বেও তাঁর লেখায় সহজপাঠ্য ভাষা, জীবন্ত চরিত্র আর পরিচিত জগতের বাস্তবতা—এই তিন অস্ত্র তিনি ছাড়েননি। মূলধারার বাংলা সাহিত্যের যে জনপ্রিয় ধারাটি পাঠককে টেনে রেখেছে, তার অন্যতম নির্মাতা হিসেবে শংকরের নাম আলাদাভাবে উচ্চারিত হয়।
আশির দশকে তাঁর কয়েকটি বড়গল্প নিয়ে প্রকাশিত হয় ‘এক ব্যাগ শংকর’। বইটি সত্যিই একটি স্বচ্ছ ব্যাগে করে বাজারে এসেছিল—বাংলা প্রকাশনার বাজারে যা রীতিমতো ব্যতিক্রমী বিপণন-কৌশল হিসেবে আলোচনায় উঠে আসে। শিরোনামেই লেখকের নামের প্রত্যক্ষ ব্যবহার—পাঠকমহলে একদিকে কৌতূহল, অন্যদিকে আপত্তি—দুই প্রতিক্রিয়াই তৈরি করে। রক্ষণশীলদের “বইও তবে পণ্য?” ধরনের ক্ষোভ থাকলেও বইটি ততক্ষণে পৌঁছে গেছে পাঠকের হাতে হাতে। উল্লেখযোগ্য, ‘বড়দের লেখক’ হিসেবে পরিচিত শংকর এখানে কিশোরদের কথাও মাথায় রেখেছিলেন। ফলে অনেকের মতে, এই বই বাংলা ‘ইয়ং-অ্যাডাল্ট’ ধারার সাহিত্যেরও একধরনের পূর্বসূরি হয়ে দাঁড়ায়—যে পথে পরে হাঁটেন বুদ্ধদেব গুহ বা সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়দের মতো লেখকেরা।
শুধু সিনেমা নয়—শংকরের লেখা থেকে মঞ্চেও এসেছে ‘চৌরঙ্গী’, ‘সম্রাট ও সুন্দরী’র মতো বাণিজ্যসফল নাটক। একসময় কলকাতার থিয়েটারপাড়ায় শংকর ছিলেন রীতিমতো চর্চিত নাম। জনপ্রিয়তার পাশাপাশি তাঁকে ঘিরে গুঞ্জন, সমালোচনা, ফিসফাসও ছিল—তিনি একই সঙ্গে নন্দিত ও নিন্দিত হয়ে ওঠেন। কিন্তু এই আলো-আঁধারিই যে আরও বেশি পাঠকের কাছে তাঁকে পৌঁছে দেয়, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
পরবর্তী সময়ে শংকর লেখেন ‘চরণ ছুঁয়ে যাই’—স্মৃতিকথা ও শ্রদ্ধালেখ্যর সংকলন, যা পাঠকমহলে ব্যাপক সাড়া ফেলে। এক সময় তিনি আকৃষ্ট হন শ্রীরামকৃষ্ণের দর্শনের প্রতি। রামকৃষ্ণদেব ও স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে একাধিক বই লেখেন; সেগুলিও জনপ্রিয় হয়। ‘শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ রহস্যামৃত’ বা ‘অচেনা অজানা বিবেকানন্দ’-এর মতো গ্রন্থগুলির মাধ্যমে সমালোচনার বাইরে এক ভিন্ন ধরনের সম্মানও তিনি আদায় করে নেন। পাশাপাশি বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতি নিয়েও তিনি লিখেছেন। কল্পকাহিনির গণ্ডি ছাড়িয়ে কখন যে তিনি সরস নন-ফিকশনেরও জনপ্রিয় লেখক হয়ে ওঠেন, তা অনেক পাঠকই টের পাননি। তিনি ক্রাইম ফিকশন বা থ্রিলার লেখেননি—তবু তাঁর লেখা পড়তে পড়তে পাঠক বহুবার নিঃশ্বাস আটকে রেখেছে। পাড়ার লাইব্রেরিতে তাঁর বইয়ের চাহিদা দীর্ঘদিন শীর্ষে ছিল। “লেখক মানেই ইন্টেলেকচুয়াল”—এই কঠোর সমীকরণের বাইরে থেকেও যে লিখনের প্রতি দায়বদ্ধ থাকা যায়, বাংলা সাহিত্যে তার বিরল উদাহরণ শংকর।
কর্মজীবনে তিনি বাংলার অন্যতম প্রধান বণিকগোষ্ঠীর জনসংযোগ বিভাগের দায়িত্ব সামলেছেন; কর্পোরেট জগতেও তিনি পরিচিত নাম হয়ে ওঠেন। তবু লেখালেখি থামেনি—লিখে গেছেন নিরন্তর। ১৯৯৩ সালে ‘ঘরের মধ্যে ঘর’ উপন্যাসের জন্য তিনি বঙ্কিম পুরস্কার পান। ২০২১ সালে পান সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার। আর ২০২২ সালে এবিপি আনন্দের পক্ষ থেকে তাঁকে ‘সেরার সেরা বাঙালি’ সম্মান দেওয়া হয়।
আজ শংকরের সাহিত্যকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, তাঁর লেখা কেবল “সাহিত্য” নয়—অনেকটাই এক দীর্ঘ সময়ের বঙ্গজীবনের দলিল। জীবিকার কঠিন পথ, শহুরে টানাপড়েন, উচ্চাশা ও হতাশার ফাঁকে ফাঁকে তিনি ক্রমে আশ্রয় নিয়েছেন আধ্যাত্মিকতার পরিসরে—আর সেই যাত্রাটিও লিখে রেখে গেছেন। বাঙালির গার্হস্থ্য থেকে বানপ্রস্থের দিকে এগিয়ে যাওয়া—এই দীর্ঘ রেখা যদি কখনও ইতিহাসের পাতায় খোঁজা হয়, শংকরের লেখা তার অন্যতম উপাদান হয়ে উঠতে পারে। বার্ধক্যজনিত অসুখে ভুগছিলেন নবতিপর এই লেখক। তাঁর শূন্যতা পূরণ করার মতো “সব্যসাচী” কি আজকের বাংলা লেখকসমাজে আছেন? হয়তো নেই। শংকর ছিলেন এক বিশেষ সময়ের সৃষ্টি—অথবা সময়ই যেন দাবি করেছিল এমন একজনকে, যিনি অন্ধকারের ভেতর থেকেও আলোচিহ্ন দেখাতে পারেন; যন্ত্রণা থেকে উত্তরণ, তামস থেকে বৈরাগ্য—এই বিপরীত স্রোতগুলিকে একই লেখনীতে ধরে রাখতে পারেন।


