উপন্যাস :এক তরফা ভালোবাসা।
পর্ব:১—— “শেষ আশ্রয়ের দরজায় নায়লা”
ঢাকার আকাশে সন্ধার স্লান আলোটা ঝুলে আছে এক অদ্ভুত বিষন্নতায়।পাখিরা ক্লান্ত ডানায় ফিরছে তাদের নীড়ে, রাস্তার বাতিগুলো একে একে জ্বলে উঠছে —– আর সেই আলোর ভেতর দিয়ে হাঁটছে এক তরুণী,ব্যাগ কাঁধে,হাতে একগুচ্ছ কাগজ। তার নাম নায়লা রহমান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্রী। সে কম্পিউটারেও বেশ দক্ষ।
চোখে কালো ফ্রেমের চশমা, চুল খোলা, মুখে চিন্তার ছাপ——-
কারণ আজ তার যাত্রা শুরু হচ্ছে এমন এক পথে, যেখান থেকে কেউ সহজে ফিরে আসে না।
নায়লার থিসিসের বিষয় :
“বৃদ্ধাশ্রমে থাকা প্রবীনদের মানসিক অবস্থার পরিবর্তন ও পারিবারিক সম্পর্কের প্রতিফলন। ”
প্রথমে বিষয়টা তার কাছে কেবল একাডেমিক ছিল। একটা প্রজেক্ট, কিছু প্রশ্নপত্র, কিছু ইন্টারভিউ, কিছু কাগজপত্র -ব্যাস।তবে, নায়লার মা একদিন নায়লা কে একটা কথা বলেছিলেন,
“মা-বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানো মানে নিজের শেকড় কেটে ফেলা “আর সেদিন থেকেই এই বিষয়টা তার মনে অন্যরকম এক ছোঁয়া ছড়িয়ে দেয়। আজ সে যাচ্ছে “সন্তানহীন শান্তিনিকেতন —ঢাকার উপকণ্ঠে অবস্থিত এক বৃদ্ধাশ্রম। নাম শুনলেই বুকটা কেঁপে উঠে। সন্তানহীন —শব্দটার মধ্যে কতটা নিঃসঙ্গতা লুকিয়ে আছে।
রাস্তা শেষে যখন রিকশা থামলো, নায়লা দেখল সামনে সাদামাটা একটি ভবন, দোতলা, ছাদের ধারে কিছু গাছ, নিচে ছোট্ট একটা বাগান। গেটের ওপরে লেখা :”সন্তানহীন শান্তিনিকেতন –শেষ আশ্রয় নয়, নতুন শুরু।
গেটের পাশে দাঁড়িয়ে এক বৃদ্ধা ফুল গাছে পানি দিচ্ছেন। চুল সাদা, চোখে কোমলতা। নায়লা এগিয়ে গিয়ে বলল —
দাদি, আপনি এই গাছগুলো লাগিয়েছেন? ”
বৃদ্ধা মৃদু হেসে বলল –“না, মা, এগুলো লাগিয়েছিল আমার ছেলে রাহি। এখন সে কানাডায় থাকে। আমি এই গাছগুলো দেখি, যেন আমার সন্তানকে দেখি। “বৃদ্ধার কথা শুনে নায়লার বুকটা ভার হয়ে গেল। মুহূর্তে চোখ ঝাপসা হয়ে এল। বৃদ্ধা বললেন, ”
জানো মা,এই গাছগুলো কথা বলে। যখন আমি পানি দেই গাছে,মনে হয় ওরা আমাকে জড়িয়ে ধরে। ”
নায়লা কিছু বলতে পারল না। চুপচাপ বৃদ্ধাশ্রম এর ভেতরে ঢুকে পড়ল। বৃদ্ধাশ্রম এর ভেতরে মিশে আছে এক ধরনের নিরবতা –না দুঃখ, না সুখ–এক অদ্ভুত ক্লান্ত প্রশান্তি। একজন বৃদ্ধ কোরআন শরিফ পড়ছেন, আরেকজন রেডিওতে পুরনো দিনের গান শুনছেন, কেউ আবার জানালার বাইরে তাকিয়ে আছেন শূন্য দৃষ্টিতে।
নায়লা গিয়ে বসে এক বৃদ্ধার পাশে। বৃদ্ধার নাম আমিনা বেগম। চোখে গভীর শান্তি, কিন্তু এই শান্তির নিচে অসীম বেদনা। নায়লা তাকে জিজ্ঞেস করল, “দাদি, আপনি এখানে কিভাবে এলেন? ”
তখন আমিনা বেগম মৃদু হেসে বললেন “আমি আসিনি মা, আমাকে রেখে গেছে ওরা। ”
নায়লা থমকে গেল।
কারা?
আমার ছেলে -মেয়েরা। আমার ছেলের বউ বলত,আমি নাকি বাড়িতে অশান্তি তৈরি করি।একদিন শুধু বলেছিলাম –নাতিটা বেশি সময় দেয় ফোনে, আরবি পড়া শেখে না,নামাজ পড়ে না।তারপর থেকে আমার মুখেই যেন বিষ। আমার মেয়েও আমার কোনো খোঁজ খবর নেই না।আমি সবার কাঁধের বোঝা হয়ে উঠেছিলাম। এসব বলে আমিনা বেগম চোখ মুছলেন আঁচলে, তারপর বললেন, তারা এখন আধুনিক হয়েছে, তাই বৃদ্ধ মা এখন তাদের সমস্যা। “নাইলা মাথা নিচু করে বসলো। তার মনে হল যেন প্রতিটি শব্দ একটা ছুরির মতো হৃদয়ে বিঁধছে।
পরের দিন নায়লা দেখা করল আব্দুল কাদের সাহেবের সাথে। সাদা দাঁড়ি,চোখে মোটা চশমা, হাতে পুরনো বই।
“আমি আগে ব্যাংকে কাজ করতাম, “তিনি বললেন।
বউ, ছেলে, নাতি —সবাই ছিল।
কিন্তু ঘরে আমার জায়গা ছিল না। একদিন বাথরুমে পড়ে গিয়েছিলাম, তিনদিন পর ওরা আমাকে এখানে রেখে গেল। ”
“ওরা আসে না? “নায়লা বলল।
“না মা,কিন্তু আমি রাগ করি না। তারা সুখে থাকুক,এটাই আমার শান্তি। তিনিও বাকি সবার মত মৃদু হাসলেন, কিন্তু সেই হাসির ভেতর এক গভীর নি:সঙ্গতা।
সেই বিকেলে নায়লা বাগানে গিয়ে বসে। ওখানে দুজন মানুষ একসাথে বসে গল্প করছে। একজন হাসিনা খালা, আরেকজনের রফিক চাচা। দুজনেই বৃদ্ধাশ্রমের স্থায়ী সদস্য। হাসিনা খালা বললেন, “জানো মা, আমি সংসার করিনি। বাবার দেখাশোনা করে কাটিয়ে দিয়েছি জীবনটা। আমার মা মারা গিয়েছিল আমার বাবার মৃত্যুর অনেক আগে। তাই বাবাকে দেখাশোনা করার মত আমি ছাড়া আর কেউই ছিলাম না। আজ বাবা মারা গেছেন প্রায় ২৫ বছর হয়ে গেছে। আর আমিও এখন বৃদ্ধ হয়ে যাচ্ছি। তাই এখন কারো কাছে বোঝা না হয়ে নিজেই চলে এসেছি বৃদ্ধাশ্রমে। ”
রফিক চাচা বললেন, “আমার তিন ছেলে, তিন ঘর।প্রত্যেকের কাছেই অপমানিত, অবহেলিত হয়েছি।তখন বুঝেছি, আমি যেখানে খুশি মরার অধিকার রাখি।
লাইলা চুপ করে শোনা যাচ্ছিল তাদের কথা। তার চোখে জল এসে গেল। এই মানুষগুলো, এক সময় যাদের ঘর ছিল, সংসার ছিল, আজ সেসব শুধুই স্মৃতি।
তিন সপ্তাহ পর। বৃদ্ধাশ্রম এর গেটে এসে থামল একটি দামি গাড়ি। গাড়ি থেকে নেমে এলো এক ভদ্রলোক –স্মার্ট পোশাক, চশমা চোখে, হাতে মোবাইল। রিসেপশন ডেস্কে গিয়ে বলল, “রুকিয়া বেগম কোথায়?
মাকে কিছু কাগজে সই দিতে হবে। ”
রুকিয়া বেগম এলেন। চোখে অবাক দৃষ্টি। ছেলে বলল -মা, তোমার নামে যে ফ্ল্যাট ছিল, সেটা এখন আমাদের নামে করতে হবে। “নায়লা পাশে দাঁড়িয়ে ছিল । রুকিয়া বেগম কাগজের দিকে তাকিয়ে বললেন, “বাড়িটা তো আমার ছেলের, আমি শুধু দাম দিয়েছিলাম। আমি সেটাও নিতে এসেছ?”
তখন নায়লা শান্ত গলায় বলল, “আপনার প্রাপ্য শুধু বাড়ি নয়, ভালোবাসাও।ওটা না পেলে কিছুতেই সই করবেন না।
ঠিক তখনই, রুকিয়া বেগমের ছেলে মুখগম্ভীর করে কাগজ নিয়ে চলে গেল। নায়লা রুকিয়া বেগমের কাঁধে হাত রাখল। তিনি চুপ করে বললেন -তুই আমার নিজের মেয়ের দিকে আপন, মা।
সেদিন রাতে, বৃদ্ধাশ্রমের ছাদে বসে নায়লা আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। চাঁদটা হালকা মেঘে ঢাকা। তার মনে হল এই আকাশের নিচে কত মা -বাবা আজ নিঃসঙ্গ, যাদের সন্তান আছে, কিন্তু তারা একা। নায়লা তার ডাযেরিতে লিখল—-
“এই সমাজে বিদ্যাশ্রম এর সংখ্যা বাড়ছে, কারণ আমাদের হৃদয়ের জায়গা কমছে। আমরা বাবা-মাকে দেখাশোনা করা দায়িত্ব মনে করি,ভালোবাসা নয়। আর ভালোবাসা যেখানে কর্তব্য হয়ে যায়,সেখানে সম্পর্ক বাঁচে না। ”
তবে নায়লা জানত না—
এই বৃদ্ধাশ্রমেই একদিন তার জীবন বদলে যাবে। এখানে এসে দেখবে এক ভালবাসার জন্ম,এক মৃত্যুর রহস্য, আর এক নি:শব্দ কষ্ট, যা তাকে নিয়ে যাবে এমন এক পথে, যেখান থেকে ফিরে আসা মানে হবে নতুন জন্ম।


