গল্প : নীরব মানুষের আর্তনাদ।
গ্রামের উত্তরের মাথায় একটা জরাজীর্ণ কুঁড়েঘর।বাড়ির চারপাশে শুকনো পাতার স্তূপ, কাঁদায় ভরা পথ,আর একটা জায়গা — যেখানে কেউ কখনো দাঁড়িয়ে বলে না,
“এই ঘরেও আলো আছে “।
সেই ঘরেই জন্মে ছিল আফরিন। কেউ তার জন্মদিন মনে রাখেনি।
মা তখন প্রসব ব্যথায় ক্লান্ত। বাবা তখন সারাদিন খেটে ক্লান্ত হয়ে রাতের অন্ধকারে বাড়ি ফিরেছেন। এক চিলতে নিস্তব্ধতা ভেদ করে যখন শিশুটির কান্না উঠল,তখন প্রথমে সবাই যে কথাটি বলেছিল–
” মেয়ে হইছে,আহা,দুঃখই তো জন্মালো।”
এই পৃথিবীতে তার আগমন এভাবেই। অভিনন্দন নয়,খুশি নয়।দুঃখ, আফসোস আর নীরব দীর্ঘশ্বাস।
তার জীবনে বড় হয়ে যাওয়ার আগেই বড় হওয়ার চাপ পড়েছিল। আট বছর বয়স থেকে তার জীবনে শৈশব শব্দটা নেই। খেলার মাঠ ছিল না,বন্ধু ছিল না,স্কুলে যাওয়াও ছিল না নিয়মিত।
মা অসুস্থ, বাবা প্রায়ই রাগী। দুই ভাই বাড়ির রাজা। আর আফরিন—
নাম আছে, কিন্তু মানুষ নেই।
ঘুম থেকে ওঠেই পানি আনা,চরকা দিয়ে ভাত রান্না, ছোট ভাই কে খাওয়ানো —
সব কাজ এমনভাবে চাপিয়ে দেওয়া হতো যেন সে জন্মেছে শুধু দায়িত্বের জন্য।
অনেকদিন তার ইচ্ছা হতো খেলতে,মাটিতে লাফাতে, কাঁদায় পা ডুবাতে অথবা ঠিক অন্য বাচ্চাদের মতো হেসে দৌড়াতে। কিন্তু সে জানত–
সেই ইচ্ছা গুলো তার নয়,
ইচ্ছা তো মানুষের থাকে।
আর সে? সে তো শুধু একটি প্রয়োজনীয় শ্রমশক্তি।
এভাবেই ছয় বছর গেল।
একদিন সকালে,
ভোর তখনও আধো-অন্ধকার।চুলার ধোঁয়া ঠিকমতো উঠছে না।ঠান্ডা বাতাসে হাত জমে যাচ্ছে। তার কাঁধে ব্যথা,ঘাড়ে ব্যথা। যেন তার বয়স চৌদ্দ বছর নয়,চুয়াত্তর বছর। দুই ভাই ঘুম থেকে ওঠে বলল,
“রুটি দে!”
“আমার জামা ধুয়েছিস?”
একটার পর একটা আদেশ। কোনো বাক্যেই “দয়া করে,ধন্যবাদ, বা কষ্ট হচ্ছে? ” এমন শব্দ নেই।
যেন তাদের সব কাজের পেছনে একজন অদৃশ্য দাসী আছে–আর সে দাসীটির নাম আফরিন।
আফরিন ছিল সাধারণ চেহারার একজন মেয়ে। গায়ের রং খুব ফর্সা না,এলোমেলো চুল,চুলও খুব বেশি নয়,
বঙ্গাভঙ্গী লাজুক।
কিন্তু মানুষ সুন্দর না হলে পৃথিবী তাকে কোনো দাম থাকে না, কেউ মূল্য দেয় না, সবাই অবহেলা করে। আর সে সেখানে যদি সে গরীব হয়,তাহলে তো আর কোনো কথায় নেই।
পাড়ার মেয়েরা তাকে বলত,”
“তুই তো কালো,তোকে কেউ কদ্দূর মানে? “
“গরীব ঘরের মেয়ে, পড়ালেখা শিখে কি করবি?”
একবার তো এক খালাও তাকে বলে ফেলল,”মা-বাবার বোঝা ছাড়া আর কিছু না।”
এই কথা গুলো আফরিনের মনে চুরিঘাত করতো।সে আয়নায় নিজের মুখ দেখত–
ভয়ে না, লজ্জায় না–
কিন্তু একটা প্রশ্নে,
“আমি কি সত্যিই কারো প্রয়োজন না?”
আফরিন স্কুলে ভর্তি ছিল। কিন্তু টাকার অভাবে বই কিনতে পারতো না।পুরনো বই পেয়ে যেদিন সে স্কুলে যেত, মনে হতো সে ভূল জায়গায় এসেছে।
কারণ শিক্ষকরা সবসময় ভালো ছাত্রদের ডাকত–
আর আফরিন?
সে ছিল চেয়ারে বসা একটা ছায়া,যাকে কেউ বেশি সময় দেখতে চাইত না।তার ক্লাসের অন্য বাচ্চারা ব্যাগ,জুতা,পেন্সিল নিয়ে গল্প করত।কিন্তু আফরিন চুপচাপ এক কোণায় বসে থাকত।
একদিন স্কুলের আঙিনায় বসে আফরিন দেখছিল শিক্ষক পড়াচ্ছেন। তখনই আফরিনের ভেতরে একটা আগুন জ্বলে উঠল–
“আমি যদি একদিন পড়াতে পারতাম….
যদি একদিন কেউ আমার কথা শুনতো..”
এই প্রথম তার মনে কোনো স্বপ্ন জন্মেছিল।
খুব বড় নয়,
খুব হাস্যকরও নয়–
শুধু একটা ছোট্ট ইচ্ছে —
মানুষ হিসেবে গণ্য হওয়া।
কিন্তু সে জানত,
এই বাড়িতে এই স্বপ্ন কেউ মানবে না।এমনকি স্বপ্ন দেখার অধিকারও তার নেই।
তারপরও একটা বিষয় মনে গেঁথে গেল —
“যা কেউ দেখে না,সেটাই হয়তো সত্যি। “
বাড়িতে অনেকদিন ঠিকমতো খাবার থাকে না। যা থাকে, আগে ভাইরা খায়।যদি বাকি থাকে, তখন আফরিন। কতদিন সে শুধু পানি খেয়ে রাত পার করেছে। মা তাকে বলত–“বাপ-ভাইয়ের কাছে খাবারের কমতি দেখাস না।”
তখন আফরিন মনে মনে হাসত।হাসি নয়—একটা তিক্ত ব্যথা।কারণ সে জানত–
এই ঘরে সে সন্তান নয়,সে শুধু দায়িত্ব।
একদিন বাবা কাজ শেষে ক্লান্ত হয়ে এসে খেতে বসেছেন।আফরিন ছুটে গিয়ে খাবার পরিবেশন করছিল। হঠাৎ হাত থেকে গ্লাস পড়ে গেল। গ্লাস ভেঙে পানি ছড়িয়ে গেল।
বাবা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন —
চিৎকার, রাগ,অপমান, সব ঝড়ে পড়ল এক মুহূর্তে তার উপর। শব্দগুলো তার কানে কাঁচের মতো ঢুকে গেল। ভাঙা গ্লাসে তার হাত কেটে গিয়েছিল। কিন্তু সে কাঁদেনি।
কান্না তো মানুষ করে,
কিন্তু সে তো নীরব এক ছায়া।
সবাই ঘুমিয়ে গেলে আফরিন উঠোনে বসে ছিল ।
আর সে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবছিল , “আমি যদি একটু ভালোবাসা পেতাম….
একটু সম্মান……
একটু মানবিক আচরণ……
তাহলে কি আমার জীবন টা এমন হতো? “
তখন তার চোখ বেয়ে পানি নামছিল চুপচাপ। কোনো শব্দ ছাড়াই। কেউ দেখেনি, কেউ শুনেনি।কারণ তার কান্না নীরব।
এটাই তার পরিচয়–
এক নীরব মানুষের আর্তনাদ।
সেদিন সে নিজের ভেতরে একটা প্রতিজ্ঞা করছিল —
“একদিন আমাকে মূল্য দিতে বাধ্য হবে সবাই —
একদিন আমি মানুষ হবো,
শুধু পরিবারের কাজের হাতিয়ার নয়।”


