গল্প : অদম্য চেষ্টা
রিয়ার জন্মের দিন বাড়িতে কেউ হাসেনি।মা বলেছিল, “ছেলে হলে ভালো হতো….. আরেকটা বোঝা বাড়ল।”
শিশু হিসেবে যার প্রথম পরিচয়ই ছিল “বোঝা ”
সে জীবনে কখনোই নিজের মূল্য বুঝতে পারেনি।
তার বেড়ে ওঠা হয়েছিল অভাবের ভেতরে,বঞ্চনার মধ্যে, আর সবসময় এক অদৃশ্য অপরাধবোধ নিয়ে —
যেন মেয়েমানুষ হয়ে জন্মানোই তার সবচেয়ে বড় ভূল।
রিয়া পড়াশোনায় খুবই ভালো ছিল। কিন্তু বাড়িতে কেউ তাকে উৎসাহ দিত না।মা বারবার বলত—
“এতো পড়াশোনা করে কি হবে? কাজ শিখ, সংসার সামলাতে হবে। ”
পাড়ার মানুষ তো আরও খারাপ—-
“মেয়েদের বেশি পড়াশোনা করলে মাথা লম্বা হয়।বাড়ির কাজ শিখুক। ”
এমন কথা শুনে রিয়া মনে মনে বলত—“আমি কি মানুষ না? আমাকে কি শুধু বোঝা হিসেবেই দেখা হবে? ”
অন্য বাচ্চারা যখন নতুন বই পেত,রিয়া তখন পেত অন্য কারো আগের বছরের পুরনো বই।যার অনেকগুলো পাতাই ছেঁড়া।
রিয়া কে কেউ স্নেহ করতো না। এর কারণও আছে। রিয়া দেখতে এতোটা সুন্দর নয়, লম্বা নয়,স্মার্ট নয়।আসলে মানুষ মানুষের চেহারা দেখেই মানুষ কে দাম দেয়। আর এটাই চিরন্তন সত্য। এ কারণেই রিয়া প্রতিক্ষেত্রেই অবহেলার শিকার হতো।কিন্তু এতো অবহেলার শিকার হওয়ার পরেও রিয়া স্বপ্ন দেখা থামায় নি।রিয়ার একটা স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে লেখক হওয়া। আর তার লেখাতে থাকবে মানুষের ভূল ধারণা মুছে ফেলার ক্ষমতা। মানুষ কে ছোট করে দেখার খারাপ দিক।চেহারা দেখে মানুষ কে বিচার করার মন-মানসিকতা যে কতো নিচু।
সে যখনই সময় পেত ,তখনই খাতায় লিখতে পছন্দ করতো। সে শব্দে শান্তি পেত।সে ভাবত,তার মনের কথা, অনুভূতি বোঝার মতো কেউ নেই –কিন্তু খাতা তো আছে। খাতা তেই সে তার মনের অনুভূতিগুলো লিখে রাখবে।
রিয়া সাহস করে একদিন তার লেখা পত্রিকায় পাঠাল।কিন্তু ফলাফল এলো না।বরং বাড়িতে কেউ জেনে হেসে বললো, “তোর লেখা কেউ পড়বে?
হাস্যকর!”
তখন রিয়া প্রথমবার ভেবেছিল—মানুষের জীবনে সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো নিজের ঘরেই পরের মতো থাকা।
এভাবে একদিন, দুইদিন, দুই বছর —
সব স্বপ্ন মরতে লাগল।
কেউ কারো স্বপ্ন ভাঙে না,
মানুষের কথায় তা ভেঙে দেয়।
দেখতে দেখতে রিয়া ম্যাট্রিক পরিক্ষা দিয়ে ফেলেছিল। ম্যাট্রিক পরিক্ষায় রিয়া খুবই ভালো রেজাল্ট করেছিল।
কিন্তু কলেজে ভর্তির টাকা ছিল না। যখন সহপাঠীরা স্বপ্ন নিয়ে স্কুলে যেত,রিয়া বাড়িতে বসে বাসন মাজত।
রাতে একা বসে কান্না করত সে— কাউকে না জানিয়ে,কেউ শুনবে না জেনে।তার বান্ধবীরা যখন ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলত,তখন সে জানত–তার কোনো ভবিষ্যৎ নেই।
লোকজন সবসময় রিয়া কে নিয়ে মন্তব্য করত—-
“মেয়ে হয়ে জন্মাইছে তাই কষ্ট।”
“ওতো চিন্তা করে কি হবে?
গরীব ঘরের মেয়ে তাই ভাগ্য মলিন। ”
“ও কিছুই করতে পারবে না ”
কিছু মানুষ তো আরও নিষ্টুর। তারা বলে,”মেয়েদের স্বপ্ন দেখা মানায় না।শেষমেষ রান্না ঘরেই মরতে হবে “।
এই কথাগুলো রিয়ার মনে চুরি ঢুকিয়ে দিত।কিন্তু সে হাসত—হাসির ভেতরে লুকিয়ে রাখত কষ্ট।
যখনই রিয়া কাউকে ভালোভাবে সাহায্য করত,মন খুলে কথা বলত,মানুষ তাকে ব্যবহার করত।
কেউই তাকে মূল্য দিত না। যা দিত–
তুচ্ছ -তাচ্ছিল্য, অবহেলা আর ঠান্ডা কথা।
একবার রিয়া ভূল করে কারও সাহায্যে অপরাগ হলে সেই মানুষ বলেছিল— তোর মতো অকাজের মানুষ কখনো দেখিনি। এই একটি বাক্যই রিয়া কে মার খাওয়ার চেয়ে বেশি আঘাত করেছিল।
রিয়া বড় হতে হতে এটা বুঝতে পেরেছিল যে- তার জন্য পৃথিবীতে কেউ নেই।বন্ধু নেই, পারিবারিক ভালোবাসা নেই, কেউ তার স্বপ্নে বিশ্বাস করে না।
কখনো কখনো সে ভাবত- আমি কি ভূল করে জন্মগ্রহণ করেছি?
কিন্তু পরক্ষণেই নিজের চোখের পানি মুছে ফেলত।কারণ কাদঁলেও কেউ জিজ্ঞেস করত না –” কি হয়েছে?”
অসহায়ত্বের সবচেয়ে খারাপ দিক হলো — মানুষ কে যখন মানুষ বলে মনে হয় না,নিজেকেও নয়।
জীবন যত তাকে নিচে নামিয়েছে,তার ভেতরে তত জেদ জন্মেছে– “সবার কথার কাছে হার মানবো না”
রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে প্রতিদিন একই কথা বলত–“হয়তো আমি কোনোদিনও সফল হবো না,কিন্তু চেষ্টা থামাব না।”
তার শব্দগুলোই তখন তার আশ্রয় হয়ে ওঠেছিল।
লেখা আর কান্নার মাঝে সে ধীরে ধীরে মানুষের অবহেলাকে পুড়িয়েই শক্তি বানাল।
রিয়া সত্যি টা মানে বাস্তবতা টা খুব ভালো করেই বুঝেছিল–“সবাই ভালোবাসা পায় না,
সবাই সমর্থন পায় না,
সবাই স্বপ্ন পূরণ করতে পারে না,
সবাই সফল হতে পারে না।”
কিছু মানুষ বাঁচে শুধু বেঁচে থাকার জন্যই।যেমন সে।
কিন্তু এর মধ্যেও একটা ব্যাপার তাকে টিকিয়ে রেখেছিল — নিজেকে একটুও না বদলানো, মানুষ যতই তুচ্ছ করে দেখুক, সে জানত—
তার ভেতরেই আছে তার আসল মূল্য।
রিয়ার জীবন আজও সহজ নয়।তার স্বপ্ন এখনও পূরণ হয়নি। নিজের অবস্থা এখনও বদলায় নি।বাড়ির অবহেলা এখনও আছে।। পৃথিবী এখনও তাকে ছোট করে দেখে।
কিন্তু সে আর আগের মতো ভাঙে না। কারণ সে জানে—
ব্যর্থতা মানুষ কে শেষ করে না,
মানুষের চোখের দৃষ্টি করে,আর
সেই দৃষ্টি সহ্য করতে পারলেই জীবন বদলায়।
রিয়া এখনও লিখে —
অন্ধকারে আলো খুঁজে, বেদনাকে গল্পে মিশিয়ে, অসহায়ত্বকে শক্তিতে পরিণত করে।এবং হয়তো একদিন কেউ তার লেখা পড়ে বলবে — “একজন অসহায় মেয়েও পৃথিবীকে বদলাতে পারে। ”
সময় থেমে থাকে না। কিন্তু রিয়ার জীবন যেন একই জায়গায় আটকে ছিল। সে যেখানে যতই চেষ্টা করে–শেষে ব্যর্থতাই জিতে যায়।
সে একদিন একটা চাকরির জন্য ইন্টারভিউতে গিয়েছিল। ভীষণ আশা ছিল —
এই চাকরি হলে নিজের টাকায় নিজের কিছু করা যাবে। কিন্তু সেখানে পৌঁছে দেখল—
তাকে দেখেই কেউ গুরুত্ব দিল না।
রিসেপশনে বসা এক মহিলা বলল—“আগে অভিজ্ঞতা দেখান।”
রিয়া বলল,”আমি নতুন “।
মহিলা ভ্রু কুঁচকে বলল— নতুনদের জন্য আমাদের এখানে জায়গা নেই।
পুরো ইন্টারভিউ না করেই তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হলো।বাড়ি ফিরে সে শুধু এটা ভাবল —
” নতুনরা অভিজ্ঞতা পাবো কোথায়? যখন শুরু করতেই দেওয়া হয় না।”
যেদিনই রিয়া মনে কষ্ট নিয়ে বাড়ি ফিরে আসে,তার বাবা-মা কখনো তার মুখ দেখে জিজ্ঞেস করেনি —
কেমন লাগছে? মন খারাপ?
সেদিনই রিয়া প্রথম বুঝতে পেরেছিল, ” মা-বাবা থাকলেই নিরাপত্তা পাওয়া যায় না, কখনো কখনো নিজের ঘরই সবচেয়ে ঠান্ডা “।
রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে রিয়া একা বসে খাতায় লিখত।কিন্তু লিখতে লিখতে মাঝে মাঝে হাত থেমে যেত।খাতার পাতা ভিজে যেত চোখের জলে।তার মনে হতো –” আমি কি সত্যিই মূল্যহীন?
আমার কি সত্যিই কোনো ভবিষ্যত নেই? ”
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কেউ দিত না। দিত একটা দীর্ঘ নীরবতা। এক রাতে সে খাতার কোণায় লিখল–“আমি কি সত্যিই পৃথিবীর কাছে কিছু না?”
কিছুদিন পরে,
রিয়া তার লেখা গল্প বিভিন্ন পত্রিকায় পাঠাতে লাগলো। কিন্তু কোনো পত্রিকা থেকেই কোনো উত্তর আসল না।কিন্তু রিয়া এখনও উত্তরের অপেক্ষায় আছে।
একদিন গভীর রাতে রিয়া রান্নাঘরে একা বসে ছিল। বাড়ির সবাই ঘুমাচ্ছিল।
তার চোখ বেয়ে জল পড়ছিল। সে ভাবছিল —
“আমি কি জন্ম থেকেই ব্যর্থ?
নাকি মানুষ আমাকে ব্যর্থ বানিয়েছে? ”
তার নিজের কাছে কোনো উত্তর ছিল না।শুধু ফিসফিস করে বলল—“আমি কি কখনো আমার মতো করে বাঁচতে পারবো…?”
দেয়াল কিছু বলল না।
রান্নাঘরও না।
অন্ধকারও না।
কিন্তু তার নীরব কান্না সব বলল।
অনেকে বাঁচে আনন্দ নিয়ে, কেউ বাঁচে স্বপ্ন নিয়ে, কেউ বাঁচে লক্ষ্য নিয়ে।
রিয়া বাঁচে শুধু….
কারণ সে মরতে চাইলেও সাহস পায় না।আর বাঁচতেও আনন্দ পায় না।
তার জীবন এক বোঝা। যা সে প্রতিদিন টেনে বেড়ায়।একটা অদৃশ্য শিকল—যা তার আর খুলে ফেলার ক্ষমতা নেই।
একদিন রিয়া মনে মনে বলল,”আমাকে কেউ ভালোবাসে না।”
কিন্তু এই কথা বলে সে ভেঙে পড়েনি।কারণ সত্য কখনো মানুষকে ভাঙে না।মিথ্যে ভাঙে।
আর তার জীবনে কোনো মিথ্যে সান্ত্বনা নেই।সে শিখে গেল—-
কষ্ট কাউকে মারে না— উপেক্ষা মারে
স্বপ্ন কেউ ভাঙে না — জীবনের প্রয়োজন ভাঙে
মানুষ খারাপ হয় না—- সমাজ তাকে খারাপ বানায়
মেয়েদের জীবন সহজ নয় — তাদের শক্ত থাকতে হয়
রিয়া আজও লড়ছে।প্রতিটা দিন নতুন ব্যাথা,নতুন অপমান,নতুন ব্যর্থতা নিয়ে। কিন্তু সে থামেনি,থামবে না।
কারণ সে জানে–
জীবন যদি তাকে জায়গা না দেয়, সে নিজের জন্য জায়গা করে নিবে।হয়তো সময় লাগবে।
তার জীবন এখনও অন্ধকার, কিন্তু সে হাঁটছে–
ধীরে,কষ্টে, তবুও সামনে।


